সমকামীদের বিয়ে? বিবাহের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞায় তার স্থান কোথায়?

রিয়াজ ওসমানী

২৩ মে ২০২২

বাংলাদেশের কিছু সমকামীরা তাদের অধিকার বলতে সমলৈঙ্গিক মানুষদের মাঝে বিবাহের প্রথা এবং অনুমোদন বুঝে। আমি বলবো যে বাংলাদেশে সমকামীদের বিয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করার সময় এখনো আসেনি। এখন মনোযোগ দেয়া উচিৎ ১) বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সংশোধনী নিয়ে (যা নিয়ে আমি আমার ব্লগে আগেই লিখেছি) এবং ২) দৃশ্যমানতার মাধ্যমে (অর্থাৎ অনলাইন ও ব্যক্তিগত বিনিময়ের মাধ্যমে) সমাজে আমাদের অবদান, অধিকার ইত্যাদি নিয়ে জনগনের মাঝে (এবং নিজেদের মাঝে) ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা নিয়ে (যদিও তা মুসলমান প্রধান দেশে পাহাড় সরানোর চেয়েও কঠিন)। এই দুটো উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সমকামীদের বিয়ে নিয়ে কথা বলা অর্থহীন।

তার উপর আছে একটি ভিন্ন ব্যাপার। বাংলাদেশে বিবাহের রাষ্ট্রীয় নীতি ধর্মীয় অনুশাসনের আদলে গঠিত। অর্থাৎ সেই বিয়েটা একটা নারী ও পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং ধর্মীয় অনুশাসন বদলানোর চেষ্টা করাটা সময়ের অপচয়। তার উপর যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষ এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ে করতে পারে না বা সেটা করতে গেলে অনেক বাধার সন্মুখীন হতে হয়, সেখানে সমকামীরা বিয়ে করতে পারবে এমনটা ভাবাও বোকামি। নাস্তিকরাও বিয়ে করতে গেলে কোনো না কোনো ধর্মীয় রীতির অধীনেই সেটা করতে হয়।

এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের আইনের খাতায় এখনও ধর্মনিরপেক্ষ বিবাহের বিধান নেই। এমন কোনো বিধান নেই যে সরকারের নির্ধারিত কর্মচারীরা বিয়ের কোনো কার্যালয়ে কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সাক্ষীদের সামনে কোনো নারী এবং পুরুষ (তারা যেই ধর্মেরই হউক না কেন) তাদেরকে স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে। সবচেয়ে আগে এরকম একটা রাষ্ট্রীয় বিধানের জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে। একজন নারী ও পুরুষ ভিন্ন ধর্মালম্বী হলে বা তাদের মাঝে একজন বা দুইজনই নাস্তিক হলে তারা এরকম একটি ধর্মহীন সরকারি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে একজন আরেকজনকে যেন বিয়ে করতে পারে। তাদের সংসার কী রকম হবে বা তাদের সন্তানরা কোন ধর্মের অনুসারী হবে (আদৌ হবে কি না) সেটা একান্ত তাদের পারিবারিক ব্যাপার হিসেবেই থেকে যাবে।

এর মানেটা হচ্ছে বাংলাদেশের আইনের খাতায় বিবাহের সংজ্ঞাটার বিস্তৃতকরণ প্রয়োজন। একই ধর্মের নারী ও পুরুষ তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তারপরও বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু যারা সেই ছকের বাইরে পড়বে, তারাও যেন বিয়ে করতে পারে, রাষ্ট্র যেন তাদের বিয়ের সমান স্বীকৃতি দেয় ইত্যাদি। এই বড় পরিবর্তনটা আনতে পারলে ভিন্ন ধর্মালম্বী বা নাস্তিকদের আর ধর্মান্তরিত হওয়ার মতো কঠিন পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে হবে না। বিয়ে করার জন্য মনে বিশ্বাস নেই এমন ধর্মে রূপান্তরিত হওয়ার নাটকের বাধ্যবাধকতা অমানবিক।

ধর্মনিরপেক্ষ বিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশে সেটা কল্পনা করাটাও কিছুটা বৈপ্লবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে এরকম বিধান অবশ্যই আনতে পারে। কারণ এতে ধর্মীয় বিয়ের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে না। শুধু যাদের পক্ষে এসকল ধর্মীয় গণ্ডির আওতায় বিয়ে করা সম্ভব নয় অথচ তারা একে অপরকে ভালোবেসে বাকিটা জীবন একত্রে কাটাতে চায়, তাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার একটা পথ খুলে যায়। ধর্মীয় বিয়ের মতো এই বিয়েগুলোও হবে রাষ্ট্রের চোখে সমান মর্যাদাপূর্ণ।

বিবাহের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞার এই বর্ধিতকরণের পরেই সমকামীদের বিয়ের প্রসঙ্গ তোলা যায়। তার আগে নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বিয়ের সংজ্ঞা আরো বিস্তৃত করা যায়, তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে এখনও স্থাপিত হয়নি। সেটা যদি কখনো স্থাপন করা যায় তো তবেই সেই সংজ্ঞাকে আরো বিস্তৃতি করে সমকামীদের বিয়ের স্থান করে দেয়া যেতে পারে। সেটাও হবে একটি ধর্মহীন সরকারি অনুষ্ঠানিকতা এবং নারী ও পুরুষের মাঝে ধর্মীয় বিয়ের সমান মর্যাদাপূর্ণ।

******************************

অভিযোগ যত বড় তার প্রমাণাদি তত বড় চাই

অধ্যাপক ইউনুস

উইকিলিক্সে তো কত কিছুই বের হয়ে আসলো। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন অধ্যাপক ইউনুসকে অপদস্ত না করতে, না হলে বিশ্ব ব্যাংক কতৃক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তার সব নথিই বের হয়ে এসেছে। খালি একটা নথিই খুঁজে পেলাম না। ইউনুস সাহেব যে নিজেই ক্লিন্টনকে অনুরোধ করেছিলেন পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করতে বিশ্ব ব্যাংককে চাপ দিতে তার কোনো ইমেল, চিঠি বা কন্ঠালাপের ফাঁস নজরে আসেনি। নেটে বহু মানুষের সাথে আলাপ করেও এরকম কিছুর হদিস পেলাম না।

অথচ এরকম প্রমাণাদি ছাড়া ইউনুস সাহেবের উপর এত বড় দেশদ্রোহিতার অভিযোগ ধোপে টিকে কী করে? শেখ হাসিনা আর তার পুত্র জয় যা বলেন তার সবই কি আদালতের কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে পারে? এমনও তো হতে পারে যে গ্রামীন ব্যাংককে কেন্দ্র করে ক্লিন্টন পরিবারের সাথে অধ্যাপক ইউনুসের দীর্ঘ বন্ধুত্বের আদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন নিজ উদ্যোগেই বাংলাদেশ সরকারের উপর পদ্মা সেতু নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে।

ইউনুস সাহেব যে নিজেই হিলারিকে অনুরোধ করেছিলেন হাসিনাকে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করবেন বলে হুমকি দিতে তার শক্ত প্রমাণাদি কই? সবাই কালেমার মতো তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রচারণা গিলেছে এবং তোতা পাখির মতো তা পুনরাবৃত্তি করেছে। কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে দৌড়!

বাংলাদেশের সমকামীদের অধিকার – অত রহস্যময় কিছুই নয়

দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা

রিয়াজ ওসমানী

২১ এপ্রিল ২০২২

বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকারের কথা উঠলে কতই না প্রসঙ্গের আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে ধর্মীয় প্রসঙ্গ একটি এবং রাষ্ট্রীয় প্রসঙ্গ আরেকটি৷ অনেকবার বলেছি যে ধর্মীয় প্রসঙ্গটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক যেহেতু দেশের দণ্ডবিধিটি শরীয়া আইন দ্বারা গঠন করা হয়নি (কোনো দিন সেটা করতেও দেয়া যাবে না)। কাজেই এই বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারটাই মুখ্য।

কিন্তু সেই প্রসঙ্গেও শোনা যায় যত আজগুবি কথা। আমাদের সংবিধানে নাকি সমকামিতা নিষিদ্ধ। এটা ডাহা মিথ্যা। সংবিধানের কোথাও এই বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা নেই। অন্য দিকে আলাদা আইন করে সমকামীদের স্বীকৃতি চাওয়াটাও অপ্রয়োজনীয়। বস্তুত সেটা কোনো দেশে করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যেটা করা হয়েছে সেটা হচ্ছে সমকামীদেরকে রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে রাখা আইনগুলোর বিলুপ্তকরণ বা পরিবর্তন।

বাংলাদেশে সেই আইনটা হচ্ছে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। অনেক দেশের মতো আমরাও বিলেতিদের রেখে যাওয়া এই কালো আইনটি স্বাধীনতা লাভের পরও রেখে দিয়েছি। এখানে ধারাটির একটি অনানুষ্ঠানিক বাংলা অনুবাদ দিলামঃ “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সাথে প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনাচারে লিপ্ত হবে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে, অথবা দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা সহ জরিমানা দিতে বাধ্য করা হবে। ব্যাখ্যাঃ এই ধারাতে উল্লেখ করা দণ্ডনীয় যৌনাচার বলতে অনুপ্রবেশই যথেষ্ট।”

এখানে যেটা লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে যে কোন প্রকার অনুপ্রবেশকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত করা হবে, তা সঠিকভাবে এই ধারাটিতে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু কালক্রমে সবাই এখানে পায়ুসঙ্গমকে বুঝে নিয়েছে এবং এর ফলে সমকামীদেরকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেছে৷ এখানে একটা বড় রকমের অযৌক্তিকতা আছে এবং এই ধারার ফলে বাংলাদেশে নারী সমকামীরাই বা কীভাবে অপরাধী হয়ে গেল সেই প্রশ্নটাও থেকে যায়।

এই আলোচনা বহু পুরানো আর তাই সেটা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে দণ্ডবিধির ধারাটি কীভাবে সংশোধন করা যায় সেটা তুলে ধরতে চাই। সংজ্ঞাটি থেকে “পুরুষ, নারী বা” শব্দগুলো বাদ দিলেই এখানে ধারাটির মানে সম্পূর্ণ বদলে যায়। ধারাটি পড়তে তখন এরকম হবেঃ “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পশুর সাথে প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনাচারে লিপ্ত হবে, তাকে……….”। অর্থাৎ ৩৭৭ ধারা তখন আর সমকামিতার বিরুদ্ধে বিবেচিত হবে না, বরং শুধু পশুকামিতার বিরুদ্ধে বিবেচিত হবে।

এই পরিবর্তনটা ছোট মনে হলেও বাংলাদেশে সেটা অর্জন করা পাহাড় সরানোর চেয়েও কঠিন, যার কারণগুলো ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক। তাই সব কিছুর আগে সবাইকে বুঝতে হবে বাংলাদেশের ঠিক কোন আইনটার ফলে কীভাবে দেশের সমকামীরা অপরাধী হয়ে গেল। তারপর সবাইকে স্পষ্ট করে বুঝতে হবে আইনটার কোন বিশেষ সংস্কারটি করতে পারলে সমকামীরা আর অপরাধী থাকবে না। ভবিষ্যতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ব্যবহার করে এই সংস্কারটি আনার কল্পনা করার আগে সবাইকে পরিষ্কার হয়ে যেতে হবে সংস্কারটা কোথাকার এবং কোন প্রকারের।

৩৭৭ ধারা নিয়ে সকলের মাঝেই একটা ধোঁয়াশা ধারণা কাজ করে৷ অনেকেই বাংলা অনুবাদটাও ঠিক মতো পড়েনি। সকলের দায়িত্ব এই প্রসঙ্গটার সম্বন্ধে ভালো করে অবহিত হয়ে যাওয়া। তারপরেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আরেকটু সহজ হয়ে আসতে পারে।

দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার এই সংস্কারটির পাশাপাশি আরেকটা অর্জনও করতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সংসদে একটি যুগান্তকারী বৈষম্যবিরোধী আইনের খসড়া উত্থাপন করা হয়েছে৷ কিন্তু এখানে কৌশলে যৌন প্রবৃত্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মতো সমকামীরাও যেন এই বৈষম্যবিরোধী আইনের আওতায় আসে, তার জন্য যেসকল জিনিষের ভিত্তিতে কারোর বিরুদ্ধে বৈষম্য করা যাবে না, সেসকল জিনিষের তালিকায় যৌন প্রবৃত্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই বিষয়ে আমাদেরকে এখনই সোচ্চার হয়ে যেতে হবে।

পাছে এখনও অনেকে একটা ব্যাপারে স্পষ্ট হতে পারেনি, এখানে আবারও উল্লেখ করে দিচ্ছি যে একটা মানুষের যৌন প্রবৃত্তি তার জন্ম কিংবা তার জন্মের ঠিক পর থেকেই নির্ধারিত, এবং সেই নির্ধারিত যৌন প্রবৃত্তি আর বদল হবার নয়। এই বাস্তবতাটি সমকামীদের বেলায়েও যা, বিষমকামীদের বেলায়েও তা।

******************************

মাদ্রাসাগুলোতে বালক ও বালিকা ধর্ষণ প্রসঙ্গে

রিয়াজ ওসমানী

৭ এপ্রিল ২০২২

মুমিনদের প্রশ্নঃ স্কুল কলেজেও তো এগুলো হয়। তখন আপনারা কই থাকেন?

উত্তরঃ স্কুল কলেজে হলেও মাদ্রাসায় হবে কেন? সেখানে তো ইসলাম শিক্ষা দেয়া হয়। আর স্কুল কলেজে যখন এগুলো হয় তখন কেউ চুপ করে থাকে না।

মুমিনদের প্রশ্নঃ তাতে কী হয়েছে, হুজুররা মানুষ না?

উত্তরঃ মানুষ যদি হয়েও থাকে তো ইসলাম শিক্ষা দেয়ার যোগ্যতা বা অধিকার তাদেরকে কে দিয়েছে? বালক-বালিকা ধর্ষণ এবং/অথবা খুন তো ইসলামের শিক্ষা যারা দেয় বলে ব্যবসা করছে, তাদের কাছ থেকে তো আশা করা যায় না! করা যায়? যদি আশা করা যায় তাহলে ইসলামের কী রূপ পাওয়া যায় সেখান থেকে?

মুমিনদের প্রশ্নঃ অল্প কয়েকজনের জন্য আপনারা বাকিদের দোষ দিচ্ছেন কেন?

উত্তরঃ অল্প না বেশি সেটা জানার জন্য চোখ খুলুন। আর অল্প জনের দোষ যদি বাকিরা ঢেকে রাখে তাহলে বাকিরাও দোষী।

বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী আইন – ২০২২

সংসদ ভবন, ঢাকা

রিয়াজ ওসমানী

৫ এপ্রিল ২০২২

বাংলাদেশের সংসদে একটি যুগান্তকারী বিল উত্থাপন করা হয়েছে যেটা পাস হলে দেশে প্রায় অনেক কিছুরই ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে এবং কেউ সেগুলোর ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার হলে কতৃপক্ষের কাছে তার জন্য প্রতিকার পেতে পারবে। এই বিলটি আইনে পরিণত হলে সেটা বাংলাদেশকে পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর কাতারের কাছে নিয়ে আসতে সহায়তা করবে। তবে বৈষম্য করা যাবে না এমন জিনিষের তালিকায় “যৌন প্রবৃত্তি” (বা সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এটা একটা বড় রকমের বাদ দেয়া বিষয়। হ্যাঁ, দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার আদলে বাংলাদেশে পায়ুসঙ্গম দন্ডনীয়। কিন্তু এতে সমকামীরা রাষ্ট্রের চোখে যে অপরাধী হবে সেটা যুক্তিহীন এবং অমানবিক (সমকামিতার সাথে পায়ুসঙ্গমের যোগাযোগটা অতিরঞ্জিত)।

তার উপর ৩৭৭ ধারাটি অনৈতিক, যুক্তিহীন এবং অপ্রয়োজনীয়। আর সমকামীদের নিয়ে ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্ম কী বললো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অপ্রাসঙ্গিক। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের দন্ডবিধি বিলেতিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া “জনসাধারণ আইন” (বা কমন লও) দ্বারা গঠিত, শরীয়া আইন দ্বারা নয় (কোনো দিন সেটা হতেও দেয়া যাবে না)।

কাজেই এই বিলটিতে বৈষম্য করা যাবে না এমন জিনিষের তালিকায় যৌন প্রবৃত্তিকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশে চিরকাল ছিলাম, আছি এবং থাকবো। এবং আমাদের যৌন প্রবৃত্তির ফলে আমরা বাসস্থান, চাকরি ক্ষেত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে আজীবন বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকতে পারি না।

আপনাদের যাদেরই কোনো সাংসদ, মন্ত্রী, আমলা ইত্যাদিতের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ আছে, তাদেরকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি তাদেরকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে যে এই মহৎ বিলটিতে “যৌন প্রবৃত্তি”কেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের সকল মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও এই ব্যাপারে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি।

এই বিলটি বহু দিন ধরে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি আইনে পাস হলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অনেক মানুষের উপর। এই উদ্যোগটি প্রতিদিন একটা দেশে নেয়া হয় না। এগুলো কয়েক দশক পর পর হয়। তাই এখানে সমকামীদের ব্যাপারটা উল্লেখ করা না থাকলে বাংলাদেশের একটা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যত অন্ধকারে থেকে যাবে। বাংলাদেশ সভ্য দেশগুলোর কাতারের কাছে এসেও ঠিক দাঁড়াতে পারবে না। আবার সেই সুযোগ কবে আসবে সেটাও অনুমান করা কষ্টসাধ্য।

আমার কষ্টের বিষয় হচ্ছে যে ২০১৫ সালের দিকে আইন কমিশনের সুপারিশে যখন এই বিলটির খসড়া তৈরি করা হয়, তখন সেখানে যৌন প্রবৃত্তি কথাটা উল্লেখ করা ছিল। মন্ত্রীদের কাছে খসড়াটা আসতে আসতেই সেটা বাদ পড়ে গেল। এমনটা আশঙ্কাও করেছিলাম। আমার সকল সমকামী তথা বৃহত্তর যৌন সংখ্যালঘু বন্ধুবান্ধব এবং শুভানুধ্যায়ীদেরকে এই লেখাটি ঢালাওভাবে প্রচার করতে অনুরোধ করছি।

******************************

বৈষম্যবিরোধী আইনের খসড়া সংসদে – দৈনিক প্রথম আলো

******************************

Britain’s Imperial Past

Prince William and Duchess of Cambridge

Riaz Osmani

28 March 2022

The United Kingdom touts itself for having abolished slavery and that is often used to conveniently ignore the country’s role prior to that abolishment. On the other hand, people in former colonies of the now defunct British Empire have been referred to as “our former friends with a shared history” and the colonial relationship between Britain and the former subjects has been described as something that has enabled “exchange of ideas”. The last bit is an improvement over notions of having “civilized” other people.

On the other hand, countries like India, Pakistan, Bangladesh and others who ditched the Queen at independence shamelessly joined a club called the Commonwealth, an association of all the former colonies and headed by the British Monarch – not very self-respecting in my opinion. And members of the royal family have been visiting all corners of the former British Empire for what exactly? Did “Brand Britain” really need promoting in countries that are still picking up the pieces after the British left?

I have gotten used to the idea that the older generation of Britons like to bask in a glorious image of their country’s imperial history. And the young generation practically know nothing. It would come as a shock to most that the Indian Subcontinent was one of the world’s most prosperous regions before the British arrived as traders. After the traders turned colonialists left 200 years later, the region was one of the world’s poorest. This did not happen by accident. It was the result of that many years of stealing wealth by stealth, upon which Britain grew richer and richer.

Britain’s stately homes are the product of the profits of the slave trade which saw Africans captured, chained, beaten, tortured and shipped from the African continent to the Caribbean and eventually to America. I won’t even mention what adorns the British museum in London. These aspects of British history are conveniently not taught in British schools today.

Instead, Britain has focused on bringing in migrants from all of the former colonies to help build the country since World War II. Impoverished people from those places have lapped up the invitation of a better life in a richer country. This has resulted in Britain changing into a multi-ethnic and multi-cultural country today and the country’s moto shifting from “Rule Britannia” to “Cool Britannia” despite all the early problems of racism and xenophobia from the native white British (note: Britain’s open door was shut after 1986 and the relationship between the British and the colonized far away, while that relationship was still in place, was also defined by racism and white superiority – yes, the colonized were all non-white) .

Young Britons today, particularly those from ethnic backgrounds are finally demanding that the British curriculum be enhanced to teach the aspect of history that had to do with their colonized ancestors. Their history is British history too by virtue of the fact that they too are British. It will be interesting to see, in a not too distant future, how far one can get by bragging about having built railroads in India or Universities here and there. Those beneficial aspects (including inherited legal systems) were byproducts, not the raison d’etre of British colonial adventures.

Oh yes, English becoming the world’s international language, thanks to the British colonialists, has helped international communication greatly too (rendering many native English speakers ignorant of other languages and the intellectual richness that come with them). One can argue that the colonialists laid the ground work for today’s globalization and all the bells and whistles that come with it. But one must place British colonial history in its right context. And that involves looking beyond the whitewashed PR that generations of natives have been fed. The Royal Family too needs to adapt to that reality.

****************************

I haven’t ascertained how Europeans justified the slave trade and to profit from it (other countries included Holland, Belgium etc.). But it has become clear how the the British justified the exploitation of India. Oxford educated Indian academic and politician Shashi Tharoor explained this eloquently in his recent book (Inglorious Empire: What the British did to India) and speeches. Once the British Crown came know about how the British East India Company held the place and people of the Indian Subcontinent under the barrel of a gun to exploit the natural resources (and established an administration/bureaucracy to support it), the Crown and its cronies went on a PR campaign to make native Britons think and believe that the British colonialists were spreading enlightenment to the Indians through British education, administration etc. i.e. they were civilizing them (as if civilization had eluded Indians during the time when the British were a bunch of pirates). This worked wonders to justify the colonization of Indians in the minds of the native Britons. The Crown at a certain later date took direct control of the vast Indian territories held by the Company.

****************************

On the issue of British education in India, educating the masses was never on the cards. The colonialists provided British education to a select few to act as the interlocutor between the rulers and the ruled. This created a new social class consisting of people who were called Babus. They were the bureaucrats whose vestiges still lurk around today. The civil service in the entire Indian Subcontinent is still very people unfriendly and the occupiers of those chairs consider themselves above the rest of the population.

****************************

বুমবাম ও মুমিন – একই মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ

রিয়াজ ওসমানী

৫ মার্চ ২০২২

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার নিন্দা করতে গেলে বা সেটা নিয়ে আলাপ করতে গেলে প্রথমেই যা লক্ষ্য করেছি, তা হচ্ছে গত একশত বছর ধরে ঘটে যাওয়া এক বা দুই পরাশক্তি দ্বারা ঘটানো বিভিন্ন যুদ্ধ বা অন্য ঘটনাগুলোর ফিরিস্তি অথবা কৈফিয়ত জিজ্ঞাসা। ভাবটা এমন যে কোনো একটা ঘটনাকে এককভাবে পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ করার কোনো অবকাশ নেই। সবই কেমন যেন একটা পূর্ব পরিকল্পিত রূপরেখারই ধারাবাহিকতা।

মুমিনদের মনে এই রূপরেখাটি হচ্ছে মুসলমান দুনিয়াটিকে চিরকাল পিষ্ট করে রাখার ইহুদি ও খ্রিস্টদের ষড়যন্ত্র। আর বুমবামদের মনে রূপরেখাটি হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্ব (প্রাক্তন সোভিয়েট ইউনিয়ন, বর্তমান রাশিয়া এবং তাদের আদর্শগত কিছু অবশিষ্ট দেশ) এবং তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক এমন কি আদর্শের দিক থেকে পিষ্ট করে রাখার জন্য প্রথম বিশ্বের (পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের) পুঁজিবাদী আগ্রাসন।

এই দুই গোত্র এক হয়ে বহু দশক ধরে স্থাপন করেছে চক্রান্তবাদের এক কারখানা। এই কারখানা থেকে কল্পনা, ভীতি আর অজ্ঞতার মিলন হয়ে ছিটকে পড়েছে বহু তত্ত্ব, অভিযোগ, আফসোস এবং অন্ধবিশ্বাসের অজস্র বস্তু। এই প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে সাধারণ মানুষের নিরক্ষরতা, ধর্ম ব্যবসা ও বাম বনিকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, সাথে বাংলা ভাষায় অবাধ বিশ্ব সংবাদের অলভ্যতা।

একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ হয়ে এই দুই গোত্র বংশের পর বংশ সকলের মগজ এমনভাবে ধোলাই করে রেখেছে যে কারো সাথে ইউক্রেন বা অন্য কোনো ঘটনা নিয়ে আলাপ করতে শুরু করলেই আমাকে হতে হয় বাকি অনেকগুলো সংঘাতের সম্মুখীন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১) ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত (সাথে সাবরা-শাতিলা, গাজা, আরো কত কী!); ২) ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুইবার হামলা; ৩) আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা; ৪) লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা; ৫) হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের আনবিক আঘাত ইত্যাদি ইত্যাদি। কৌশলবসত কারণে অথবা জারি করা অজ্ঞতার ফলে যেই ঘটনাগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ১) ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে প্রাক্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের ১০ বছর আফগানিস্তান অবৈধভাবে দখল; ২) সম্প্রতি সিরিয়ায় রাশিয়ার বোমাবাজিতে অসংখ্য মুসলমানের প্রাণহাণি; ৩) চেচনিয়াতে রাশিয়া দ্বারা অসংখ্য মানুষ হত্যা; ৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জাপানের বর্বর চেহারা ও কীর্তি; ৫) সাম্প্রতিক কালে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর উত্থানের আসল কারণ ও কীর্তি ৬) সৌদি আরব দ্বারা ইয়েমেন ধ্বংস ও হাজার হাজার মুসলমান হত্যা; ৭) আল-কায়দা ও আইএস দ্বারা সারা দুনিয়াতে হাজার হাজার মুসলমান ও অমুসলমান হত্যা; ৮) শিয়া ইরান ও সুন্নি ইরাকের দীর্ঘ দিনের সংঘাত ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথমে উল্লেখিত যেই ঘটনাগুলোর সন্মুখীন হই, অনেক নেটবৃন্দ সেগুলোর নাম মাত্রই উল্লেখ করে, অনেকটা গা ঝাঁকুনির মতো করে। কিন্তু একেকটি ঘটনার সামান্য বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে আমি আরও সন্মুখীন হই অজ্ঞতার, আংশিক সত্যের, ভুল তথ্যের বা ডাহা মিথ্যার। মুখস্ত করা তালিকার ঘটনাগুলোর প্রকৃত ইতিহাস জানার কোনো প্রয়াস দেখিনি। দেখিনি তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা অভিমত। জল্পনা-কল্পনা, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, সবই পেয়েছি। শুধু পাইনি তথ্য উপাত্ত। এই অপসংষ্কৃতির মাঝে বস্তুনিষ্ঠতার কোনো গুরুত্ব দেখিনি। দেখেছি শুধু একপেশে চর্বিত চর্বণ। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য আমাদেরকে এই অপসংষ্কৃতিকে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রত্যেকটি ঘটনার নির্দিষ্ট পটভূমি ও ইতিহাস রয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনা তার নিজস্ব আলোচনার দাবিদার। একটা প্রসঙ্গ আসলেই তোতাপাখির মতো আরো ৫-১০টা প্রসঙ্গ টেনে এনে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। একটা ঘটনার বিস্তারিত ইতিহাস জানা ১০টা ঘটনার মুখস্ত করা নাম উচ্চারণের চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। আমি আমার ব্লগে পালাক্রমে কিছু কিছু ঘটনার আসল ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি উইকিপিডিয়ায় গবেষণা করে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আল-কায়দা এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর আবির্ভাবের আসল কারণ (না, মুসলমানদের সর্বনাশ করার জন্য আমেরিকা বা ইসরায়েল সেগুলো তৈরি করে দেয়নি)। আর ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতটাও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কৃপায় সকলের ধারণা অনুযায়ী এতটা একপেশে নয়।

নবপ্রজন্মকে উদবুদ্ধ করতে হবে আমাদের আগের প্রজন্ম (কিংবা তারও আগের প্রজন্ম) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বৈশ্বিক ইতিহাস, চক্রান্তবাদী চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা ইত্যাদি পরিহার করে গত একশত বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর আসল এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। এর জন্য এখন আন্তর্জাল (সাথে ইংরেজি লেখার ভাঙ্গা বাংলা অনুবাদ) সহজেই লভ্য। আর চলমান বৈশ্বিক ঘটনাবলি অনুসরণ করার জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম ব্যবহার করার জন্যেও তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। আমার মতে বাংলা ভাষায় বর্তমানে এই মাধ্যমগুলো হচ্ছে বিবিসি বাংলা আর ডয়েচে ভেলে বাংলা। গত এক সপ্তাহে ফেসবুকে বুমবাম আর মুমিনদের পক্ষ থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা সংক্রান্ত যেই সকল আবর্জনা প্রকাশিত হয়েছে এবং যেগুলো কিচির মিচির করা অজ্ঞ নবীনদের দ্বারা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে তা সত্যিই পীড়াদায়ক। মুমিন আর বুমবামরা একটা ভুক্তভোগীর চেতনা বিক্রি করে এত দিন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এটাকে আর প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।


প্রসঙ্গ রেঙ্গু এবং মাহমুদ

পরিমার্জিত এবং পুনঃপ্রকাশিত

রিয়াজ ওসমানী

২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২

২০০০ সাল কিংবা তার থেকে এক বা দুই বছর আগের কথা। আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব খবরাখবর আর যোগাযোগ রাখতে শুরু করি। বাংলাদেশেও তখন থেকে আস্তে আস্তে নেটের প্রসার শুরু হয়। ভ্রমণ সংক্রান্ত জালপাতা থর্নট্রি’র (Thorntree) বাংলাদেশ শাখায় এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়। সেখানে আমার মত তিনিও বাংলাদেশে বেড়াতে আসার জন্য উদগ্রীব বিদেশি পর্যটকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং বাংলাদেশ সম্বন্ধে সাধারণ তথ্য বিলি করতেন। দেখলাম যে এই দিক থেকে তার আর আমার চিন্তাভাবনা এক। তবে বিরাট একটা পার্থক্য ছিল আমাদের নিজস্ব অবস্থানে। আমি বাস করতাম মিশিগান অঙ্গরাষ্ট্রের “এন আরবার” উপশহরে আর তিনি থাকতেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। কিন্তু এই দুই প্রান্ত থেকেই আমরা বিদেশি প্রশ্নদাতাতের সাহায্য করতে থাকি এবং সময়ের সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করে ফেলি।

আমি আস্তে আস্তে তার একটা আসক্তির সাথে পরিচিত হই। তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা চালাতেন যার নাম বাংলাদেশ ইকোট্যুরস (Bangladesh Ecotours). এ কোনো পাঁচ-দশটা ট্রাভেল এজেন্সির মত ছিল না। এ ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসীদের নিয়ে একটা অলাভজনক সংস্থা। বিদেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি পর্যটকরা অল্প সংখ্যায় কিন্তু প্রতিনিয়ত বেড়াতে এসে আদিবাসী পল্লীগুলোতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। বিনিময়ে অতিথিরা পেতেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এবং এর থেকে পাওয়া উপার্জনের সিংহভাগই ব্যয় করা হত আদিবাসী পরিবারগুলোর কল্যাণে।

আমি এতটাই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম তার এই উদ্যোগে যে আমি ক্ষণিক সময়ের জন্য আমার তখনকার আরামদায়ক জীবন ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে চেয়েছিলাম তার কাছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম – এইসব জায়গায় ঘাটি করে তার সাথে কাজ করবো পর্যটক আর আদিবাসী পরিবারের কল্যাণে। সাথে তার ব্যবসার সহায়তা আর প্রসার করে বাংলাদেশের পর্যটন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখারও সুযোগ পেতাম। কিন্তু তা আর হয়নি নানা কারণে (তিনিই আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন)। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কীভাবে তার পাশে দাঁড়াতে পারি সেই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। এবং সেই থেকেই তার আরেকটি লক্ষনীয় ব্যাপার সম্বন্ধে জানতে পারি।

তিনি নিজে ছিলেন একজন সমকামী পুরুষ। আমার যত দূর মনে পড়ে, তিনি অর্ধেক বাংলাদেশি আদিবাসী আর অর্ধেক ক্যানাডিয়ান অর্থাৎ মিশ্র জাতির ছিলেন। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার সময়ে তার বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মত হবে। দীর্ঘ দিন ক্যানাডাতে বড় হওয়া ও বাস করার পর তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন আদিবাসীদের কল্যানে বাকিটা জীবনটা উৎসর্গ করে দিতে। ভদ্রলোকের নাম ছিল রেঙ্গু। তবে তিনি খালি ম্রো, চাকমা, ইত্যাদি মানুষদের জন্যই নিজেকে নিবেদিত করেননি – তিনি সতর্কতার সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমকামীদেরকেও সহায়তা করতেন। তিনি ইয়াহুতে (Yahoo) যথাযথ নাম দিয়ে একটি গোষ্ঠির পাতা খুলেন যেখানে নেটের মাধ্যমে দেশের সমকামীরা নিজের গোপনীয়তা বজায়ে রেখে একে অন্যের সাথে মিলিত হতে পারতো, কথা বলতে পারতো। আমার জানা মতে এটাই ছিল বাংলাদেশি যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য প্রথম আন্তর্জাল ভিত্তিক একটি মিলন স্থান। এখানে তিনি ডেভিড (David) নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন এবং তখন শুধু ইংরেজিতেই কথোপকথনের ব্যবস্থা ছিল।

আমি তো এত দিন ভেবে বসেছিলাম যে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি সমকামী! বাংলাদেশে আর কোনো সমকামী নেই, থাকতেও পারে না। কিন্তু সেখানে ঢুকে দেখি অজস্র প্রোফাইল। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশি গে দের সাথে কথাবার্তাও শুরু হয়ে গেল। আমি নতুন এক ভুবন আবিষ্কার করলাম। আমার প্রাক্তন ভালবাসার এক মানুষ আমাকে বলেছিল যে সে নাকি তখন থেকেই আমাকে চেনে। এবং এর সব কিছুরই উদ্যোক্তা ছিলেন রেঙ্গু। আমি আর রেঙ্গু তারপর প্রায়ই চিন্তা করতাম কীভাবে বাংলাদেশ ইকোট্যুরসে বিদেশি সমকামী পর্যটকদেরকেও আকৃষ্ট করা যায়।

বেশ কিছু দিন তার কোনো খবর না পাওয়ার পর তাকে একটা ইমেল পাঠাই খোঁজ নেয়ার জন্য। অনেক দিন পর একটা উত্তর এলো তার এক ঘনিষ্ট বাঙ্গালী সহকর্মীর কাছ থেকে যে রেঙ্গু আর নেই – পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণের সময়ে তিনি এক প্রকার মশার কামড়ের ফলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তারপর তিনি মারা যান। এই খবর আমি কীভাবে হজম করতে পেরেছি এখন আর মনে নেই। নিজের জীবন তখন বেশ চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল এবং আমি ২০০৩ সালে বিলেতের লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করি। সেজন্যই বোধহয় শোক প্রকাশ করার সময় পাইনি। কিন্তু আজ তার কথা মনে না করলেই নয়। আমার জীবনে দুইজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। দুইজনই বাংলাদেশের ভ্রমণ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন আর দুইজনই আজ আর নেই। আর বেঁচে থাকার সময়ে রেঙ্গু বাংলাদেশের সমকামীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যেই অবদান রেখে গেছেন তার জন্য বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘুরা চিরকাল ঋণী হয়ে থাকবে। তিনিই বলতে গেলে বাংলাদেশে তখন নবাগত আন্তর্জালের মাধ্যমে সামান্য হলেও সাংগঠনিক কাজ শুরু করে দিয়ে গেছেন আমাদের জন্য। আর আদিবাসীদের জন্য তিনি যা করে গেছেন সেটা তো প্রশংসার দাবিদার বটেই। বাংলাদেশ ইকোট্যুরসকে ভুলে না গিয়ে আমরা সেটাকে সমর্থন করতে পারি। রেঙ্গুর অনুসারীরা এখনও সেটা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে আমার বিশ্বাস।

—————————————————–

দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি হচ্ছেন মাহমুদ হাসান খান যার সাথেও থর্নট্রি’র বাংলাদেশ শাখায় পরিচয়। তিনি নিজের সফল কর্মজীবনের বাইরে দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ হয়ে বিদেশি ও কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশ ভ্রমণ নিয়ে সব রকম সহায়তা করতেন। প্রাথমিক তথ্য বিলি থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানো, সকল বাজেট অনুযায়ী আবাস জোগাড় করে দেয়া, সকল ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট কেটে দেয়া এবং সুযোগ পেলে বরিশালে তার গ্রামের বাড়ির দেশে আতিথেয়তা প্রদান করা – কোনো কিছুই বাকি রাখেননি তিনি। এবং এগুলো সব তিনি অনেক বছর করেছেন সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় এবং দেশব্যাপী তার স্বেচ্ছাসেবক মানুষদের কাজে খাটিয়ে। পরে বিদেশিদেরই অধিক অনুরোধে তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা ট্রিপটুবাংলাদেশ (Trip To Bangladesh) খুলে বসেন স্বল্প বাজেটের বিদেশি পর্যটক বা ব্যাকপ্যাকারদের স্বল্প মূল্যে সকল প্রকার সেবা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। সেই সাথে ফেসবুক গোষ্ঠী “বেড়াই বাংলাদেশ”-এর মাধ্যমে তিনি দেশের ভেতরে বিভিন্ন জানা অজানা জায়গায় দেশি ভাই-বোনদের বেড়ানোর একটা চল শুরু করে দিয়েছেন। সমকামী জগতের সাথে তার অবশ্য কোনো পরিচয় একেবারেই ছিল না।

রেঙ্গুর সাথে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু মাহমুদ ভাইয়ের সাথে দেশে দেখা হয়েছে অনেক বার। তিনি ঢাকায় বসে কাজ করতেন, আমি ছিলাম লন্ডনে অবস্থিত তারই এক সহকর্মীর মত। তবে কিছু সময় পার হয়ে গেছে তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে তার ছোট্ট পরিবার ও আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। দেশ-বিদেশের বহু অনুরাগী এই শোকে এখনো মর্মাহত।

Bangladesh Ecotours

Trip 2 Bangladesh

**********************

বাংলাদেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম

রিয়াজ ওসমানী

৫ জানুয়ারী ২০২২

১৯৭২ সালে ডঃ কামাল হোসেন এবং তার সহকর্মী দ্বারা লিখিত বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী বাংলাদেশের সংবিধানের “ধর্মনিরপেক্ষতা” নামক মূলমন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক পঞ্চম সংশোধনী এনে সংবিধানের শুরুতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে “বিসমিল্লাহ” লিখলেন। তারপর ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনী এনে এরশাদ সাহেব সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম” আনলেন। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের উচ্চ আদালত পঞ্চম এবং অষ্টম সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে। এর ফলে সংবিধানে কোথাও বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম থাকার অবকাশ ছিল না। কিন্তু ২০১১ সালে সংবিধান পুনঃপ্রকাশ করার সময়ে শেখ হাসিনা ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে সংবিধানে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখলেন। আদালত অবমাননা ছাড়াও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার আদলে শেখ হাসিনার এই কীর্তিকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য উচ্চ আদলতের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তবে এই ব্যাপারে উচ্চ আদালতের সদিচ্ছা এবং সৎ সাহস নেই সেটা জেনেই এই ব্লগটা লিখলাম।

বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাব। কিন্তু তার অর্থ কী এবং কেন?

রিয়াজ ওসমানী

২৬ অক্টোবর ২০২১

বাহাত্তর সনে লিখিত বাংলাদেশের সংবিধানের চারটা মূলমন্ত্রের দুটো থেকেই বাংলাদেশ আজ বিচ্যুত। এই দুটো হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র। বাকি দুটো হচ্ছে গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রও মৃত্যু সজ্জায় কিন্তু সেই আলাপ আরেক দিনের। আজকে ধর্মনিপেক্ষতায় কেন এবং কীভাবে ফিরে যাব সেটা নিয়ে আলাপ। এর সাথে সমাজতন্ত্রের মূল আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বর্তমান মুক্ত বাজার ব্যবস্থা কিভাবে চলমান রাখা সম্ভব সেটা নিয়েও আলাপ থাকছে। সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে বর্তমান যুগের বাস্তবতা থেকেই। প্রাতিষ্ঠানিক সাম্যবাদ (কমিউনিজম) একটা ব্যর্থ রূপরেখা। এই রূপরেখা নিয়ে যারা এখনো দিবা স্বপ্ন দেখেন তারা নতুন করে দেশকে কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখেন না। মানুষে মানুষে সাম্যতার আরেকটা ব্যাখ্যা হতে পারে মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনা। এবং সেটা কায়েম করার রূপরেখা পৃথিবীতে আজ প্রতিষ্ঠিত। এই লেখার শেষাংশে সেটা নিয়ে আলাপ হবে। বাহাত্তর সনে ফিরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরিয়ে আনা এবং সমাজতন্ত্রের একটি পরিবর্তিত ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে বাংলাদেশে সেটার বাস্তবায়ন করা।

প্রশ্নঃ বাহাত্তর সনের সংবিধানে কেন ফিরে যাবো? উত্তরঃ কারণ সেই সংবিধান থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে আজ বাংলাদেশ একটা সাম্প্রদায়িক, অচেনা দেশ এবং যেই দেশে মানুষে মানুষে বৈষম্য বেড়েই চলছে, যেটা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উভয়ই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই বলুন আর সংবিধান লেখকদের দর্শনই বলুন, দুটোর কোনটাই বাংলাদেশের বর্তমান চেহারার উৎস বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা আজ অপরপ্রান্ত থেকে দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কিছু ফেলছে বলে মনে করলে ভুল হবে। সংবিধানের লেখকরা চেয়েছিলেন এমন একটা দেশ যেখানে সকল ধর্মের সকল মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে সমান। সেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্যও থাকবে না। আজ সমাজ নিয়ে কথা নয়, কথা রাষ্ট্র নিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষতার মানেই হচ্ছে রাষ্ট্রের চোখে সকল ধর্মের মানুষ হবে সমান। এর অর্থ এও দাঁড়ায় যে সকল ধর্ম হবে সমান। রাষ্ট্রের চোখে বিশেষ কোনো ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। দিলেই বাকি ধর্মগুলোর অবস্থান নিম্নতর পর্যায় চলে যায় এবং সেই বাকি ধর্মের অবলম্বনকারীরাও সেই নিম্নস্তরে চলে আসে।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থাৎ মুসলমানদের কাছে জেনারেল এরশাদ তার সামরিক ক্ষমতা আরো জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বানিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্ট ধর্মালম্বী, অন্যান্য ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদেরকে যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে ফেলেছেন সেটা কি নব প্রজন্মের কাছে অধিক যুক্তি দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন আছে? ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা দেয়ার পর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সেই ধর্ম সময়ের সাথে সাথে যে অধিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে সেগুলোর জলজ্যান্ত প্রমাণ তুলে ধরার প্রয়োজন আছে কি? এই অধিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার বাহ্যিক প্রতিফলন যে ধর্মনিরপেক্ষতা নামক সাংবিধানিক স্তম্ভের পরিপন্থী সেটার বিশ্লেষণ কি তুলে ধরা দরকার? আর একটা রাষ্ট্রধর্ম থাকার ফলে সেই ধর্মের বাইরের মানুষদের নিম্নস্তরে চলে আসাটা যে গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক সেটা কি উল্লেখ করে দিতে হবে? অনেক মুমিনদের মুখে শুনেছি যে দেশের ৯০% মানুষ (অর্থাৎ মুসলমান)রা যা চাইবে সেটাই গণতন্ত্র। কখনোই না। হ্যাঁ! ভোটের বাক্সে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আরেক জিনিষ। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছা এমনভাবে পূরণ করতে হবে যে (যে কোনো) সংখ্যালঘুদের স্বার্থ যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। এই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক লড়াইটার নাম গণতন্ত্র।

মুমিন থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের অনেকেই বলে থাকেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। অবশ্যই তা নয়। রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা সেভাবে কে দিয়েছে? ধর্ম তো বিশ্বাস ও পালন করছে মানুষ। রাষ্ট্র তো ধর্ম পালন করছে না! রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম না থাকলেও মানুষ যে ধর্ম পালন করবে সেখানে বাধা আসছে কোথা থেকে? মুমিনদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারছি কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের উক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিতে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে দিলে ইসলামের ক্ষতি কীভাবে হচ্ছে! রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও বাংলাদেশে আগে কি মুসলমান ছিল না? সমস্যাটা কোথায়? আমি বলি সমস্যাটা কোথায়। সমস্যাটা অনুভূতি নামক এক অযৌক্তিক জায়গায়। এই জায়গায় যুক্তির কোনো ঠাই নেই। আছে অজ্ঞতা এবং অন্ধবিশ্বাসের একটা বিষফোঁড়া। আছে অনুর্বর মস্তিষ্ক এবং চেতনার একটা ফাঁকা ও উত্তপ্ত আবেগ।

এই আবেগটাকে যে জেনারেল এরশাদ কীভাবে কাজে লাগিয়ে মুমিন সবাইকে কদু বানিয়েছেন তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কি? ব্যক্তিগতভাবে একজন লম্পট মানুষ কি ইসলামের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা থেকে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম এনেছিলেন? না, সেই কারণে আনেননি। এনেছিলেন বাংলাদেশের অধিক মানুষদেরকে কদু বানাতে এবং সেই কাজে তিনি সাঙ্ঘাতিকভাবে সফল হয়েছেন। সেই ধারা অনুসরণ করে বিএনপি-জামাত দেশ চালিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ হেফাজত লালন করেছে। উল্লেখ্য যে এরশাদ সাহেব সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আনার পর প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই সেটার বিরোধিতা করেছিল। আজ ক্ষমতার লোভে এরা সংবিধানের এই জায়গাটি স্পর্শ করতে অপারগ এবং তার একটি মাত্র কারণ মানুষের সেই অযৌক্তিক আবেগের ভয়।

অথচ আজ বাংলাদেশের একটা রূপ বিশ্লেষণ করি? ১৯৭৫ সালের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কেরামতির ফলে ধীরে ধীরে বিদেশ থেকে পুনর্বাসিত জামাতে ইসলামী সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে প্রবেশ করে মুসলমানদেরকে শিখিয়েছে যে অন্যদের তুলনায় তারাই শ্রেষ্ঠ, তাদের ধর্মই প্রকৃত ধর্ম। ভিন্ন ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকরা সৃষ্টির সেরা জীব তো নয়ই বরং তারা হচ্ছে বর্জ্য পদার্থ। এই চিত্রটির সাথে যোগ হয়েছে আলেম সমাজ যেভাবে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াজ মাহফিলে কীভাবে দায়মুক্তভাবে বিভিন্ন “ধর্মীয়” বক্তারা ভিন্ন ধর্মালম্বীদের উদ্দেশ্যে বিষদগার ছড়িয়েছে, সাধারণ মুসলমানদের মনে অন্য ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদের বিষয়ে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে, তার ফল আমরা আজ দেখছি। সম্প্রতি শারদীয় পূজার সময়ে হনুমানের পায়ে কোরআন রাখা হয়েছে শুনে কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে দৌড়ে পশুতুল্য কিছু মানুষ দেশ জুড়ে অনায়াসে অজস্র মন্দির ও হিন্দু বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেললো। কিছু মানুষের প্রাণহানিও ঘটলো। আবার দিনের শেষে দেখা গেল মুসলমান নামের এক ব্যক্তিই হনুমানের পায়ে কোরআনটি রেখেছিল হিন্দুদের সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য, যেই লক্ষ্যে সেই ব্যক্তিটি সম্পূর্ণ সফল হলো।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো যে এই ধরণের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বাংলাদেশের এই সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন বহু দিনের এবং ৭৫ সালের পর থেকেই সেটাকে কৌশলে পরিচালনা করা হয়েছে। ৭৫ সালের পর বলছি কেন? কারণ তারপরেই জেলারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধানে বিসমিল্লাহ বসিয়ে সংবিধানের ইসলামিকরণ শুরু করলেন। সংবিধানটা যেন শুধু মুসলমানদের। তিনি সংবিধানে আরো কিছু ইসলামী বিষয় ঢুঁকিয়েছিলেন যেগুলো শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান থেকে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু উপরে উল্লেখিত আবেগের ভয়ে তিনি সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম সরাননি। বাকিটা ইতিহাস। বাংলাদেশের আলেম সমাজ নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় কিছুটা ঊর্ধ্বে মনে করে এসেছে – তারাই রাজা, বাকিরা প্রজা। তারা অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাকিরা নারাজ – ইসলামের ক্ষতি হবে এই ভয়ে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনও তাদের ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে চলেছে যার ফলে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে এত দিন ধরে ঘটে আসা বালক ধর্ষণ ও অন্যান্য নির্যাতন ছিল ধামাচাপা দেয়া।

আমার মতে বাংলাদেশের এই সাম্প্রদায়িক ও মুসলমান কেন্দ্রিক চেহারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম আসার পরেই জাগ্রত হতে শুরু করে। এবং এখান থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসার শুরুটাও করতে হবে সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম সরিয়ে দিয়ে। এতে মানুষ রাতারাতি অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে না, যেমনি মানুষ রাতারাতি সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়নি। তবে অসাম্প্রদায়িক যাত্রার শুরুটা করা যাবে। বিভিন্ন বক্তব্যদাতা এবং সাংবাদিকরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য মুখে বড় বড় ফ্যানা তুলেন। কিন্তু আসল জায়গায় সকলে যেতে নারাজ। বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম সরিয়ে ফেলার কথা বললে নিজের ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে যায়, এমন অবস্থা। তাই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তারা হাওয়া বাতাস নিয়ে কথা বলেন। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার করে যেই বক্তব্যগুলো রেখেছেন সেটা উল্লেখযোগ্য। সরকার হয়তো এর মাধ্যমে জনমত যাচাই করার চেষ্টা করছে। আমার মতে তিনি এই বিষয়ে একটা ছোটখাটো ঢেউ তুলে দিয়ে গেছেন। আমাদের এখন উচিৎ বজ্রকণ্ঠে এই ঢেউটিকে হিমালয়ের সমান উঁচু করে ফেলা। এবং সেটা করতে হবে রাষ্ট্রের স্বার্থে, আমাদের সংবিধানের স্বার্থে, সকল ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদের সমান অবস্থানের স্বার্থে। বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে ফেলতে হবে। এই ব্যাপারে জনমত তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। জনমত তৈরি হলেই সরকার তা করবে। ধর্ম যার যার, সংবিধান সবার।

*********************

এবার আসি সমাজতন্ত্র নিয়ে। আগেই বলেছি যে প্রাতিষ্ঠানিক সাম্যবাদ একটি ব্যর্থ রূপরেখা। কিন্তু মানুষে মানুষে সাম্যতা একটি মহৎ আদর্শ। মুক্তবাজার অর্থনীতি বলবৎ রেখেই মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনার রূপরেখা আমরা পাই পশ্চিমা ইউরোপের দেশগুলো থেকে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে “কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা” যার ইংরেজি হচ্ছে ওয়েলফেয়ার স্টেইট (welfare state). এখানে সরকার বিত্তবান সহ সকল মানুষদের কাছ থেকে প্রগতিশীল কর (আয় অনুপাতে বেশি হারের কর) আদায় করে একটা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বহাল রাখে। এটা গড়ে তুলতে সময় লাগে। কিন্তু এর ফলে মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হয়। একেক পশ্চিমা দেশে এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি একেক রকম। আমার মতে বাংলাদেশে এটার পরিধি হওয়া উচিৎ সকলের জন্য সমানভাবে লভ্য উন্নত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মানুষের মাঝে বৈষম্য কমাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই হতে হবে একমুখী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমানভাবে লভ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যবসা আর চলবে না। আর যার অর্থ আছে শুধু সেই ভালো চিকিৎসা পাবে, সেটা অনৈতিক। এই ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর বাজেটের ১০% উভয় ক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে। এই দুটো খাত ছাড়াও দরিদ্র, বৃদ্ধ, বিধবা, দিন মজুর, কৃষক, এদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে হবে। বেকারদের নূন্যতম ভাতার কথাও চিন্তা করতে হবে। শেষের কয়েকটি প্রকল্প বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান। এগুলোর পরিধি বাড়াতে হবে। জনগণের দায়িত্ব থাকবে সকলের ন্যায্য পরিমাণ কর কোষাগারে পৌছে দিতে একনিষ্ঠ হওয়া এবং প্রশাসনকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করা।

এই সমাজ ব্যবস্থায় একটি মানুষের ব্যক্তিগত অগ্রগতি কখনই নির্ভর করবে না তার অভিভাবকের অর্থের উপর। যার উপর তা নির্ভর করবে তা হচ্ছে তার মেধা, চেষ্টা ও শ্রম। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। বাকিটা তার নিজের উপর। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পেনশনের উপরেও জোর দিতে হবে বৃদ্ধ বয়সে কাওকে যেন তার সন্তানের উপর নির্ভর করতে না হয়। আমাদের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের এরকম একটা ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দেয়া থাকতে হবে। বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করার পন্থা হবে একটা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাহলেই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া নিয়ে পুঁজিবাদীদের আর আপত্তি থাকবে না, বামপন্থীরাও কথায় কথায় “পশ্চিমা বেনিয়া”, “পুঁজিবাদীদের আগ্রাসন” ইত্যাদি উচ্চারণ করে বাতাস ভারি করে ফেলবে না। বরং বাংলাদেশকে তার জন্মকালীন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সকলেই একমত হতে পারবে।

**********************