রিয়াজ ওসমানী

২৩ মে ২০২২

বাংলাদেশের কিছু সমকামীরা তাদের অধিকার বলতে সমলৈঙ্গিক মানুষদের মাঝে বিবাহের প্রথা এবং অনুমোদন বুঝে। আমি বলবো যে বাংলাদেশে সমকামীদের বিয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করার সময় এখনো আসেনি। এখন মনোযোগ দেয়া উচিৎ ১) বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সংশোধনী নিয়ে (যা নিয়ে আমি আমার ব্লগে আগেই লিখেছি) এবং ২) দৃশ্যমানতার মাধ্যমে (অর্থাৎ অনলাইন ও ব্যক্তিগত বিনিময়ের মাধ্যমে) সমাজে আমাদের অবদান, অধিকার ইত্যাদি নিয়ে জনগনের মাঝে (এবং নিজেদের মাঝে) ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা নিয়ে (যদিও তা মুসলমান প্রধান দেশে পাহাড় সরানোর চেয়েও কঠিন)। এই দুটো উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সমকামীদের বিয়ে নিয়ে কথা বলা অর্থহীন।

তার উপর আছে একটি ভিন্ন ব্যাপার। বাংলাদেশে বিবাহের রাষ্ট্রীয় নীতি ধর্মীয় অনুশাসনের আদলে গঠিত। অর্থাৎ সেই বিয়েটা একটা নারী ও পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং ধর্মীয় অনুশাসন বদলানোর চেষ্টা করাটা সময়ের অপচয়। তার উপর যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষ এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ে করতে পারে না বা সেটা করতে গেলে অনেক বাধার সন্মুখীন হতে হয়, সেখানে সমকামীরা বিয়ে করতে পারবে এমনটা ভাবাও বোকামি। নাস্তিকরাও বিয়ে করতে গেলে কোনো না কোনো ধর্মীয় রীতির অধীনেই সেটা করতে হয়।

এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের আইনের খাতায় এখনও ধর্মনিরপেক্ষ বিবাহের বিধান নেই। এমন কোনো বিধান নেই যে সরকারের নির্ধারিত কর্মচারীরা বিয়ের কোনো কার্যালয়ে কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সাক্ষীদের সামনে কোনো নারী এবং পুরুষ (তারা যেই ধর্মেরই হউক না কেন) তাদেরকে স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে। সবচেয়ে আগে এরকম একটা রাষ্ট্রীয় বিধানের জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে। একজন নারী ও পুরুষ ভিন্ন ধর্মালম্বী হলে বা তাদের মাঝে একজন বা দুইজনই নাস্তিক হলে তারা এরকম একটি ধর্মহীন সরকারি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে একজন আরেকজনকে যেন বিয়ে করতে পারে। তাদের সংসার কী রকম হবে বা তাদের সন্তানরা কোন ধর্মের অনুসারী হবে (আদৌ হবে কি না) সেটা একান্ত তাদের পারিবারিক ব্যাপার হিসেবেই থেকে যাবে।

এর মানেটা হচ্ছে বাংলাদেশের আইনের খাতায় বিবাহের সংজ্ঞাটার বিস্তৃতকরণ প্রয়োজন। একই ধর্মের নারী ও পুরুষ তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তারপরও বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু যারা সেই ছকের বাইরে পড়বে, তারাও যেন বিয়ে করতে পারে, রাষ্ট্র যেন তাদের বিয়ের সমান স্বীকৃতি দেয় ইত্যাদি। এই বড় পরিবর্তনটা আনতে পারলে ভিন্ন ধর্মালম্বী বা নাস্তিকদের আর ধর্মান্তরিত হওয়ার মতো কঠিন পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে হবে না। বিয়ে করার জন্য মনে বিশ্বাস নেই এমন ধর্মে রূপান্তরিত হওয়ার নাটকের বাধ্যবাধকতা অমানবিক।

ধর্মনিরপেক্ষ বিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশে সেটা কল্পনা করাটাও কিছুটা বৈপ্লবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে এরকম বিধান অবশ্যই আনতে পারে। কারণ এতে ধর্মীয় বিয়ের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে না। শুধু যাদের পক্ষে এসকল ধর্মীয় গণ্ডির আওতায় বিয়ে করা সম্ভব নয় অথচ তারা একে অপরকে ভালোবেসে বাকিটা জীবন একত্রে কাটাতে চায়, তাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার একটা পথ খুলে যায়। ধর্মীয় বিয়ের মতো এই বিয়েগুলোও হবে রাষ্ট্রের চোখে সমান মর্যাদাপূর্ণ।

বিবাহের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞার এই বর্ধিতকরণের পরেই সমকামীদের বিয়ের প্রসঙ্গ তোলা যায়। তার আগে নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বিয়ের সংজ্ঞা আরো বিস্তৃত করা যায়, তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে এখনও স্থাপিত হয়নি। সেটা যদি কখনো স্থাপন করা যায় তো তবেই সেই সংজ্ঞাকে আরো বিস্তৃতি করে সমকামীদের বিয়ের স্থান করে দেয়া যেতে পারে। সেটাও হবে একটি ধর্মহীন সরকারি অনুষ্ঠানিকতা এবং নারী ও পুরুষের মাঝে ধর্মীয় বিয়ের সমান মর্যাদাপূর্ণ। সেই বিবাহগুলো হবে লিঙ্গ এবং লিঙ্গ পরিচয় নিরপেক্ষ। অর্থাৎ সমকামীদের পাশাপাশি রূপান্তরকামী, আন্তঃলিঙ্গ, অদ্বৈত ইত্যাদি মানুষরাও নিজেদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতেই বিয়ে করতে পারবে – কোনো বিশেষ ধর্মের বিধান এবং নারী-পুরুষ ছকের আওতায় না।

******************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s