রিয়াজ ওসমানী

৫ অক্টোবর ২০২০

বাংলাদেশে সম্প্রতি নারী ধর্ষণের ধারাবাহিকতা সবাইকে স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত করেছে এবং মাঠেও পুনরায় নামতে বাধ্য করেছে। আমি এই আন্দোলনের সফলতা কামনা করছি। এই সব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস সহ অন্যান্য মদদের উৎস উদ্ঘাটন করা জরুরী। দোষীদেরকে যথাযথ আইনে শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং এই সব ঘটনার শিকার নারীদেরকে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও মানসিক সহায়তা ও সমর্থন দিতে হবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমাদেরকে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিৎ। ধর্ষণ রোধ করা কি শুধু আইন প্রয়োগের ব্যাপার? সকল ধর্ষকদের ধরে ধরে কয়েদী বানালে, বা তাদের পুরুষাঙ্গ কেঁটে ফেললে বা তাদেরকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করে ফেললে আমরা কি আসলেই ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবো? নতুন নতুন ধর্ষকদের আগমন রোধ করার উপায় কি আসলে এগুলোই?

প্রশ্নটা করছি কারণ একজন ধর্ষককে যথাযথ সাজা দিয়েও নতুন আরেকজন ধর্ষকের আগমনকে ঠেকানো যাবে বলে আমার মনে হয় না। ধর্ষণের জন্য দেশে কঠোর শাস্তি ও তার প্রয়োগের বিধান থাকলে এই অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা থাকবে, একটা প্রতিবন্ধকতা থাকবে। কিন্তু ধর্ষক তৈরি বন্ধ হবে না। এর কারণ, শুধু সচেতনতা দিয়ে বা নারীকে সন্মান দেখাতে শিখিয়ে একটা যৌন বিস্ফোরণ (সাথে যৌন ক্ষমতার অপব্যবহার) কে আটকানো সহজ হলে এতো দিনে এই পৃথিবী থেকে নারী ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যেত। সেটা না হয়ে আমরা বরং আমাদের ধর্মীয় সামাজিক রীতির আওতায় একেকজন (পুরুষ) ধর্ষক তৈরি করছি যাদেরকে যে কেউই উস্কানি দিয়ে একটা নিরীহ নারী বা শিশুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সফল করতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালের পর ছেলেদের যৌন উত্তেজনা তুঙ্গে থাকে আঠারো (১৮) বছর বয়সে। মেয়েদের সেটা হয় আরো পরে (কথাটা ভুল হলে আমি দুঃখিত)। অথচ ধর্মীয় সামাজিক রীতি অনুযায়ী সকলের বিবাহপূর্ব যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ। আবার ধর্মীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আঠারো বছর বয়সে সকল ছেলেকে একটা মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দেয়াটাও দায়িত্বহীনতার কাজ যেহেতু সেই বয়সে একটা ছেলের সংসার চালানোর মতো আর্থিক, পেশাভিত্তিক ও মানসিক ক্ষমতা নাও থাকতে পারে (মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই)। ফলে যেটা দাঁড়ায় যে অনেক ছেলেরাই আছে যারা ২৫-৩০ বছর বয়স অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত কোনো প্রকার যৌন অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। তার উপর যারা কট্টর ইসলামে বিশ্বাসী, তারা শিখেছে যে হস্তমৈথুন করা হারাম। তাদেরকে শিখানো হয় বিয়ের আগ পর্যন্ত নামাজ-কোরআন পড়ে সকল দৈহিক যৌন চাহিদা উপেক্ষা করতে এবং সেগুলোকে দমন করে রাখতে।

এবার আপনারাই বলুন। একটা মানুষের স্বাভাবিক যৌনতাকে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে বিবাহপূর্বক অবদমন করে রাখার ফলে আমরা কি কিছু অসুস্থ মানুষ তৈরি করছি না? যেই মানুষটাকে প্রাপ্তবয়স লাভ করার পর যৌনভাবে ক্ষুধার্ত করে রাখা হয়েছে, সে কি এক সময়ে কোনো বিশেষ চুলকানি বা উস্কানি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হিংস্র হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না? এখানে খাঁচায় বন্দী বাঘের তুলনা করলে ভুল হবে না। আমরা কি এরকম একটা সমাজে বাস করি, যেখানে যৌন চুলকানি বা উস্কানি থাকবে না? এটা তো অবান্তর! একজন পুরুষের অবশ্যই দায়িত্ব নিজের উত্তেজনাকে সংযম করে রাখা – সেই দায়িত্ব আর কারোর না, নারীদের এবং তাদের পোশাকের তো নয়ই। কিন্তু আমরা একটা বিশেষ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এদেরকে জীবন কাঁটাতে বাধ্য করে এদের দায়িত্বটাকে আরো কঠিন করে দিচ্ছি কেন? আমরাই তো এই ধর্ষকদের তৈরি করছি। যে কোনো পুরুষেরই সম্ভাবনা আছে একজন ধর্ষক হয়ে যাওয়ার। কয়জনকে আপনারা বন্দুকযুদ্ধে মারবেন?

সময় এসেছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজের একটা আগাগোড়া সংস্কারের, হোক সেটা সময় সাপেক্ষ। সমস্যার গোঁড়া উন্মোচন করলে দেখা যাবে যে বর্তমান ধর্মীয় রীতি এই মহামারী রোধে ব্যর্থ। এবং ধর্মীয় রীতির আরো কঠোর প্রয়োগ তৈরি করবে আরো যৌনক্ষুধার্ত পুরুষ এবং মহিলা। আমি বলবো এটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। আর এই কারণেই সৌদি আরবের মতো কট্টর ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা দেশটিতেও নারীদের উপর ধর্ষণ সহ সকল প্রকার অন্যায় বিদ্যমান, যদিও তার সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে ধর্ষণের নিরাময় আরো বেশি ধর্ম নয়, আরো কম ধর্ম। আঠারো বছর বয়স অতিক্রম করার পর যুবক ও যুবতিদের মাঝে বিয়েপূর্বক যৌনাচারকে আমাদের স্বাভাবিক মনে করতে হবে। এই যৌনাচার প্রেমের আলিঙ্গনে হতে পারে আবার নাও হতে পারে। পরিচিত একজন আরেকজনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সম্পূর্ণ সন্মতিতে একজন আরেকজনকে আনন্দ দেয়ার কারণেও এই যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার অবকাশ থাকতে হবে। এই যৌন সম্পর্কের উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে একজন আরেকজনকে বিয়ে করা হতে পারে আবার নাও হতে পারে। নিরাপদ যৌনকর্ম অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ বা যৌনরোগ সংক্রমনকে বিরত রাখতে পারবে। বাংলাদেশের উচ্চ আধুনিক সমাজে এই রীতির কিছুটা হদিস এখনই বিদ্যমান। অন্যত্রও এই রীতি পরিবার ও লোকচক্ষুর অন্তরালে চলছে। বিয়ের পর যৌনসঙ্গী হিসেবে তারা একজন আরেকজনকে একক হিসেবে রাখবে কি না সেটা একান্ত তাদের সিদ্ধান্ত। তবে সেখানে থাকতে হবে সততা, সচ্ছতা এবং সন্মতি। প্রতারণামূলক পরকীয়ার কোনো স্থান নেই একটা সুস্থ বিবাহ জীবনে।

পরষ্পর সন্মান বজায়ে রেখে যারা প্রাপ্তবয়স থেকেই সন্মতিসূচক যৌনাচারে লিপ্ত হতে শিখে এবং যৌনক্ষুধা থেকে রেহাই পেয়ে জীবনের স্বাদ পেতে পারে, তারা কোনো এক সময়ে ধর্ষক হয়ে উঠবে, সেই সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। তাদেরকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য উস্কানি দিয়ে কারোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করার সফলতার সম্ভাবনাও কম। নারীদের পোশাক, হাত, পেট, বুক, পাছা এগুলো তাদেরকে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বিপজ্জনক করে তুলবে না। নারীরাও সমাজের সর্বস্তরে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবে বোরখা-হিজাবের কথা না ভেবে। সুস্থ যৌনতায় তৃপ্ত মানুষরা কখনো ধর্ষক হয় না। ধর্ষক তারাই হয় যারা যৌনভাবে অবদমিত এবং অসুস্থ। এবং সেই অসুস্থতা আমরাই তাদের মাঝে তৈরি করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি একটি ব্যর্থ ধর্মীয় রীতির ছত্রছায়ায়।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s